কাক, মুক্ত সাংবাদিকতা ও তলা ছিড়াঁ প্যান্ট
লেখক: মোহাম্মাদ আল মাসুম মোল্লা
সাংবাদিক
পৃথিবীতে যত নোংরা পাখি আছে তার মধ্যে কাক নিঃসন্দেহে অন্যতম নোংরা। চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে প্রথমও হয়ে যেতে পারে। ঠিক কি কারনে কাক ময়লা আবর্জনা থেকে তার খাবার সংগ্রহ করে তা আমি জানি না কারন আমি তো আর পাখি বিজ্ঞানী সলিম আলি না।কাক খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে খুব যে সচেতন সেটা বলা যাবে না কারন অনেকটা সময়র্বভুক প্রজাতির। তবে কাকের নৈতিকতা খুবই প্রবল। কাকের একটি বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তা হলো কাক তার প্রজাতির ব্যাপারে অত্যন্ত সমব্যাথী।
খেয়াল করে দেখবেন একটা কাক যখন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায় তার আশেপাশে অসংখ্য কাক এসে কা কা রবে চিৎকার করে সমবেদনা প্রকাশ করতে থাকে। কোন একটি কাক যদি বিপদে পড়ে তখন আশেপাশের কাকেরা এসে বিপদগ্রস্ত কাকটিকে উদ্ধারে চেষ্টা করে। এসব গুনের কারনেই নাকি অন্য কোন কারণ আছে তার জানিনা তবে মানুষের সমাজে একটা কথা বহুল প্রচলিত সেটা হলো কাক কাকের মাংস খায়না।
এই প্রবাদটি কাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও মানুষ নামধারী সাংবাদিকদের জন্য কতোটা প্রযোজ্য সেটা ভেবে দেখা দরকার। গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা সংবাদকে কেন্দ্র করে মানুষ দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
খবরটি হলো দেশের বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ও পত্রিকাটির সহযোগী প্রকাশনা কিশোর আলোর সম্পাদক আনিসুল হকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার একটি আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
কারন গত ১ নভেম্বর ঢাকার রেসিডেনসিয়াল কলেজে কিশোর আলোর বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নবম শ্রেণীর ছাত্র নাইমুল আবরার নিহত হবার ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। ওই ছাত্রের বাবার করা সেই মামলায় অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়।
এই গ্রেফতারি পরোয়ানা কতোটা যুক্তিযুক্ত সেটা নিয়ে বিতর্ক চলছে। কিন্তু সাংবাদিক সংগঠন গুলো এখনো নিশ্চুপ। কারন অনেকেই মনে মনে চাচ্ছেন এইবার প্রথম আলোরে একটা “সাইজ” করা যাইবে।
এ মামলার উদ্দেশ্য ও বিধেয় যে কি তার সহজেই অনুমেয়। এটা বুঝতে কোন সংবাদ বিশ্লেষণের দরকার নাই। স্বাধীন সাংবাদিকতা সব সময় সরকারের জন্য একটা আতঙ্ক। এটা শুধু বাংলাদেশ নয় সারাবিশ্বেই। কেন বলা হচ্ছে এটা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে রুদ্ধ করার জন্য তা একটু খুলেই বলি।
গত বছরের ২৮ জুলাই, তিতাস ঘোষ নামে এক কিশোর মারা যায় কারন মুমুর্ষ তিতাসকে বহনকারী এম্বুলেন্স টি ফেরিঘাটে অনেকটা সময় আটকে থাকে এক তথাকথিত সরকারী আমলার জন্য। ঐ ঘটনায় কিন্তু ঐ আমলার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি।
আরেকটা উদাহরণ দেয়া যাক। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে চট্টগ্রামের প্রয়াত সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ১০ জন নিহত হয়েছেন।ঐ ঘটনায় সাবেক মেয়রের পরিবারের কারো বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।
এবার আসেন যুক্তি তর্কে। প্রথম আলোর সহযোগী সংগঠন কিশোর আলো আয়োজিত ঘটনায় দুর্ঘটনাবশত আবরারের মৃত্যুর জন্য প্রথম আলোর সম্পাদকের বিরুদ্ধে হত্যার মামলা হয় কিন্তু চট্টগ্রামের সাবেক মেয়রের কুলখানির ঘটনায় পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় কিন্তু কোন মামলা হয়নি।
বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার ঘটনায় কিন্তু বুয়েট ভিসির বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়নি। কোন প্রথম আলোর সম্পাদকের বিরুদ্ধে হয়। এরকম অজস্র উদাহরণ দেয়া যাবে।
সব দেখে, সব শুনে, সব বুঝেও নিরব সাংবাদিক সংগঠনগুলো, সাংবাদিকরা দ্বিধাবিভক্ত। অনেকেই প্রহর গুনছেন কখন আসবে সে মাহেন্দ্রক্ষণ। অনেকেই হয়তো আরো বেশি কিছু চিন্তা করছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে। বর্তমানে সংবাদপত্র শিল্পের যে দুরাবস্থা চলছে তার দায় দায়িত্বের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী আপোসকামি সাংবাদিকতা আর চাটুকারিতা।
একটা ছোট গল্প দিয়ে আজকের লেখা শেষ করি। এক কিপ্টে বাবা তার ছেলেকে এক জুড়া নতুন জুতা কিনে দিয়ে বললো খুব সাবধানে হাটতে যেন জুতার তলা বেশি ক্ষয় না হয়। বাব বললো সিড়ি দিয়ে উঠার সময় ছেলে যেন দুইটা করে সিড়ি একসাথে উঠে।ছেলে হলো বাবার চেয়ে আরো এক কাঠি সরেস। ছেলে এতোটাই সচেতন যে সিড়ি দিয়ে উঠার সময় তিনটা করে সিড়ি একসাথে উঠে।
বাসায় আসার পরেই বাবা চড় লাগালো ছেলেকে। ঘটনার আকস্মিকতায় ছেলের মা জিজ্ঞেস করলো কেন চড় মারা হলো। বাবা রেগে গিয়ে বললো ওকে বলেছিলাম দুই সিড়ি একসাথে উঠতে কিন্তু তিন সিড়ি একসাথে উঠতে তো কেউ তাকে বলেনি। মেজাজ ঠিক থাকে কিভাবে, ওতো ২০০ টাকার জুতার তলা বাঁচাতে গিয়ে ৮০০ টাকার প্যান্টের তলা ছিঁড়ে ফেলেছে।
খেয়াল রাখতে হবে প্যান্টের তলা যেনো আমরা ছিঁড়ে না ফেলি।


No comments