ঢাকার মসনাদে কারা!
ঢাকার মসনাদে কারা!
মো. ফরিদ উদ্দিন মাসুদ,
বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পৃথিবী যখন বিশ্ব মহামারীর কবলে তখন সেই মহামারী নিয়েই কথা বলতে হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নোভেল করোনা ভাইরাসে সারা বিশ্বে মৃত্যুবরণ করেছে দেড় লাখের-ও অধিক মানুষ এবং আক্রান্ত হয়েছে ২২ লক্ষাধিক। চিনে প্রথম চিহ্নিত এই ভাইরাস আজ বিশ্ব অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো এখন পর্যন্ত এর সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। আমাদের দেশের সাথে চিনের বানিজ্য সম্পর্ক সবচেয়ে উপরের দিকে। বলতে সবার উপরে। শুধু আমরা কেনো চিন তামাম দুনিয়ার সাথে খুব গলায় গলায় বানিজ্য করতে এগিয়ে এসেছে এবং তারা তা করতে পেরেছে। সারা দুনিয়ায় যে পরিমাণ চিনা শ্রমিক কাজ করে, তারা যদি একদিন কাজ করা বাদ দিয়ে বসে থাকে বোধ করি সারা দুনিয়াই বসে থাকবে। যাইহোক বলছিলাম যে চিনের সাথে আমাদের বানিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। যেহেতু চিনের সাথে আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সেহেতু এই ছোঁয়াচে যে আমাদের কাছে খুব সহজেই চলে আসবে তা সহজেই অনুমেয় ছিলো। আমরা দেশবাসী ভেবেছিলাম আমাদের একজন রাণী আছেন যিনি সঠিক প্রস্তুতি নিয়েই রাখবেন। আমাদের এই ভাবনার আরেকটি কারণ ছিলো যে আমাদের এমপি মন্ত্রীরা এ নিয়ে যে সমস্ত বাগাড়ম্বর পূর্ণ বক্তব্য দিয়ে এসেছেন তাতে মনে হচ্ছিলো যে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। বস্তুত আমরা এখন বুঝতে পারছি আমরা সবচেয়ে বেশি অপ্রস্তুত।
আমাদের প্রস্তুতি বলতে গেলে শুন্যের কোটায়। কারণ আমরা এক করোনার ভয়ে অন্য সকল রোগীর জন্য হাসপাতালের দরজা বন্ধ করে দিয়েছি। এই সময়ে মুষ্টিমেয় কিছু করোনা রোগী ব্যতিত বাকিরা চিকিৎসা পাচ্ছেননা। সকল বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কি তাও আমাদের অজানা। আমাদের প্রস্তুতি বলতে, পর্যাপ্ত কিটের ব্যবস্থা না করতে পারা, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর না থাকা,পর্যাপ্ত আই সি ইউ না থাকা, বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টিনে রাখতে না পারা ইত্যাদি। এবার আসি করোনা মোকাবিলায় : বাংলাদেশ বেতারে সকাল সাতটার খবরের মাঝ বিরতিতে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শোনা যায়। সেখানে তিনি বলেন যে বাঙালী বীরের জাতি। ৭১ সালে যেমন বীরত্ব দেখিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশকে জয় করেছে ঠিক তেমনি নাকি করোনা ভাইরাস মোকাবেলা করতে পারবে। সত্যি কথা বলতে গেলে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় শক্তিসামর্থ্য পুরোপুরি উহ্য বিষয়। যদি তা নাই হতো আমেরিকা এমন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তোনা। এবার আসি আমাদের মন্ত্রীদের কথায়। আগে একটু দেখে নিই স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবের মন্ত্রীসভায় যারা সচিবালয়ে ছিলেন তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন : শিক্ষা সচিব : অধ্যাপক কবির চৌধুরী। স্বাস্থ্য সচিব : মুজিব নগর সরকারের চিকিৎসক তোফাজ্জল হোসেন। গণপূর্ত সচিব : প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম। তথ্য সচিব : সাংবাদিক বাহাউদ্দিন চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু প্রতিটি সেক্টরে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুধাবন করেছিলেন তার প্রতিফলন উপরের ক'জনের নাম দিয়েই বুঝতে পারি। আমরা জয় বাংলা জাতীয় স্লোগান করি, মুজিব বর্ষ পালন করি, বঙ্গবন্ধুর নামে কত কি করি কিন্তু তার দেখানো পথ অনুসরণ করিনা। এটাকে বলা যেতে পারে, ফরজ রেখে নফল নিয়ে টানাটানি করা। আর যদি বর্তমান মন্ত্রণালয়গুলোর দিকে তাকাই তবে দেখবো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়গুলোতে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। একটু দেখে নিই সরকারের মন্ত্রীসভায় মাননীয় কিছু মন্ত্রীদের নাম ও শিক্ষাগতযোগ্যতা : ওবায়দুল কাদের : সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয় - বি এ (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ কে আব্দুল মোমেন : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - এম এ (অর্থনীতি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নর্থ-ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, বোস্টন (পিএইচডি)।
ড. হাছান মাহমুদ : তথ্য মন্ত্রণালয় - এমএসসি (রসায়ন) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব লিমবার্গ (পিএইচডি)।
আনিসুল হক - আইন মন্ত্রণালয় - এম এ (ইংরেজি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়, এএলএম, কিংস কলেজ, লন্ডন। তাজুল ইসলাম : স্থানীয় সরকার - মাস্টার্স (অর্থনীতি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ড. দিপু মনি : শিক্ষামন্ত্রী - এমবিবিএস, ঢাকা মেডিকেল কলেজ। মাস্টার্স অব ল, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন। পাবলিক হেলথ, জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি।
সাধন চন্দ্র মজুমদার : খাদ্য মন্ত্রণালয় - বি. এ
টিপু মুনশি : বাণিজ্যমন্ত্রণালয় - বি. এ
নুরুজ্জামান আহমেদ : সমাজ কল্যান মন্ত্রণালয় - বি. কম
শ ম রেজাউল করিম : গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। - বি. এ অনার্স( বর্তমানে তাকে অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে)।
মোস্তফা জব্বার : ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় - বিএ (বাংলা) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মাস্টার্স (সাংবাদিকতা) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই হলো আমাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয় গুলোর অবস্থা। এর ফলাফল হচ্ছে একজন তার কাজ ঠিক মতো করতে না পেরে তা ঢাকতে সে প্রবাসীদের নবাবজাদা বলে সমালোচিত হন। তিনি একবারও ভাবেননি যে তিনি প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের টাকায় এখনো বেতন নেন এবং আগেও নিয়েছেন। দিপু মনি একজন ডাক্তার, জন হপকিন্সে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়েছে তার। প্রথমবার তাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রী না করে করা হলো পররাষ্ট্র মন্ত্রী কিন্তু কেন তা করা হয়েছিলো এখনো আমি বুঝিনি। তখন যাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রী করা হয়েছিলো সে প্রশ্নপত্র ফাঁসের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের দিয়েছে। যে ব্যাচে এ কাজ হয়েছে সেই ব্যাচের কিছু ছেলেপেলে এই আপদকালীন সময়ে ইন্টার্নিশিপ করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ভেবেছিলাম আমাদের শিক্ষা হয়েছে এবার অন্তত দিপু মনি কিংবা ডাক্তার কাউকে দেখবো এই জায়গায়। এইবারও দিপু মনি হলেন শিক্ষা মন্ত্রী। কারণ আগে যিনি এখানে ছিলেন তিনি মাশাল্লাহ! শিক্ষা ব্যবস্থার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। গণহারে জিপিএ-৫ এবং গণহারে পাশের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে সেই সাথে প্রশ্নফাঁস তো ছিলো নিয়মিত ঘটনা। আর প্রতিটি জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার বাসনায় গ্রাজুয়েশনকে মামুলি বানিয়ে ফেলেছেন। সৃষ্ট হয়েছে সাত কলেজের মত আপদ!
এবার আসি স্বাস্থ্য মন্ত্রীর কাছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। এটা স্বাভাবিক তিনি শেক্সপিয়ার যত বুঝবেন চিকিৎসাবিদ্যা তার সিকি ভাগও বুঝেবন না। তার প্রমাণ হলো পিপিই এর স্থলে পিপিপি শুনি আমরা। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য সচিব তিনিও নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। আর একজন আছে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। তার লেখাপড়া অতি উচ্চ কিন্তু কথাবার্তায় মনে হয় তিনি তথ্য মন্ত্রী নন বিএনপি বিষয়ক মন্ত্রী। আমরা এখন বাংলা সাহিত্যের ছাত্র দিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ চালাচ্ছি তা খারাপ কি!
আমরা ক্রিকেট জ্ঞানহীন ব্যক্তিকে বিসিবি প্রধান করি। সাবেক অধিনায়ক সাংসদ থাকার পরও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিই আরেকজনকে যার ফলে দেখি ক্রিকেটাররা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে স্ট্রাইক করে। এগুলোই প্রমাণ করে সরকারের বড় বড় পদে কারা বসেছে। কারা চালাচ্ছে ঢাকার মসনাদ! এবার আসি বিরোধী দলের দিকে। বিভিন্ন দেশে বিরোধী দল ছায়া মন্ত্রীসভা গঠন করে সরকারের কাজের সমালোচনা করে থাকেন। আমাদের একটি কাগজে কলমে বিরোধী দল আছে কিন্তু কাজেকর্মে তা সরকারি। কথাবার্তায় পুরোপুরি আওয়ামী নির্ভর একটি দল। অনেকে এই দল নিয়ে হাসাহাসি করেন। আর একটি দল আছে যারা নিজেদের রাজপথের বিরোধী দল বলে দাবি করেন কিন্তু আমরা তাদের রাজপথ বলতে নয়াপল্টনের সেই পথকেই চিনি অন্যকোনো রাজপথে গত ৭-৮ বছরে বিএনপিকে সেভাবে দেখা যায়নি। বিএনপির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো বিকল্প নেতা তৈরী করতে না পারা। এক খালেদা জিয়ার উপর ভরসা করা বিএনপি এখন যাচ্ছেতাই। এর প্রমাণ হলো গত নির্বাচনে তারা ভাড়া করা নেতা নিয়ে আসলো। রাজনীতির জন্য বিপদ সংকেত হলো যে এতো বড় একটা দল অথচ খালেদা জিয়ার বিকল্প নাই। একজন আছে তাও আবার লন্ডনে বসে রাজনীতির চর্চা করেন। আওয়ামীলীগের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো এই দলটিও শেখ হাসিনার বিকল্প কাউকে বের করতে পারেনি। এর প্রমাণ হলো গতবছর শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন তার ছুটি প্রয়োজন কিন্তু দলের অন্যরা তখন বললেন না তিনি যতদিন থাকবেন ততদিন তিনিই আওয়ামিলীগ প্রধান থাকবেন। ১৯৯১ থেকে এখন পর্যন্ত বড় দুইদল দেশ শাসন করছে ঘুরেফিরে কিন্তু এই দুইজনের বাইরে কোনো আমরা তৈরী করতে পারিনি। এর জন্য হয়তো আমাদের যোগ্য নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগতে হবে। একটি দেশ যখন শিক্ষাখাত এবং চিকিৎসা খাতে অপেক্ষাকৃত কম বিনিয়োগ করে। শিক্ষকদের বেতন ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা সরকারি আমলাদের তুলনায় নগন্য হয়, একটি দেশ যখন এমন ক্রান্তিলগ্নে দলমত নির্বিশেষে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করতে পারেনা, একটি দেশের মন্ত্রীরা যখন জ্বি হুজুর জি হুজুর করে অভ্যস্থ, একটি দেশের শিক্ষকরা যখন রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলে, সরকার যখন শুধু দৃশ্যমান উন্নয়নে বিভোর থাকে তবে সে দেশ শুধু করোনা কেন যেকোনো দুর্যোগেই ধ্বসে যেতে পারে। ভেঙে যেতে পারে দেশের সার্বিক অর্থনীতি।
একটি কথা আছে বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃ কোলে। আমাদেরও এই কথাটা বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। যে যেখানে বিশেষজ্ঞ তাকে সেখানেই দিতে হবে। তবে যদি এমনটা হয় তবে যদি আমরা পারি!
মো. ফরিদ উদ্দিন মাসুদ,
বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পৃথিবী যখন বিশ্ব মহামারীর কবলে তখন সেই মহামারী নিয়েই কথা বলতে হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নোভেল করোনা ভাইরাসে সারা বিশ্বে মৃত্যুবরণ করেছে দেড় লাখের-ও অধিক মানুষ এবং আক্রান্ত হয়েছে ২২ লক্ষাধিক। চিনে প্রথম চিহ্নিত এই ভাইরাস আজ বিশ্ব অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো এখন পর্যন্ত এর সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। আমাদের দেশের সাথে চিনের বানিজ্য সম্পর্ক সবচেয়ে উপরের দিকে। বলতে সবার উপরে। শুধু আমরা কেনো চিন তামাম দুনিয়ার সাথে খুব গলায় গলায় বানিজ্য করতে এগিয়ে এসেছে এবং তারা তা করতে পেরেছে। সারা দুনিয়ায় যে পরিমাণ চিনা শ্রমিক কাজ করে, তারা যদি একদিন কাজ করা বাদ দিয়ে বসে থাকে বোধ করি সারা দুনিয়াই বসে থাকবে। যাইহোক বলছিলাম যে চিনের সাথে আমাদের বানিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। যেহেতু চিনের সাথে আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সেহেতু এই ছোঁয়াচে যে আমাদের কাছে খুব সহজেই চলে আসবে তা সহজেই অনুমেয় ছিলো। আমরা দেশবাসী ভেবেছিলাম আমাদের একজন রাণী আছেন যিনি সঠিক প্রস্তুতি নিয়েই রাখবেন। আমাদের এই ভাবনার আরেকটি কারণ ছিলো যে আমাদের এমপি মন্ত্রীরা এ নিয়ে যে সমস্ত বাগাড়ম্বর পূর্ণ বক্তব্য দিয়ে এসেছেন তাতে মনে হচ্ছিলো যে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। বস্তুত আমরা এখন বুঝতে পারছি আমরা সবচেয়ে বেশি অপ্রস্তুত।
আমাদের প্রস্তুতি বলতে গেলে শুন্যের কোটায়। কারণ আমরা এক করোনার ভয়ে অন্য সকল রোগীর জন্য হাসপাতালের দরজা বন্ধ করে দিয়েছি। এই সময়ে মুষ্টিমেয় কিছু করোনা রোগী ব্যতিত বাকিরা চিকিৎসা পাচ্ছেননা। সকল বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কি তাও আমাদের অজানা। আমাদের প্রস্তুতি বলতে, পর্যাপ্ত কিটের ব্যবস্থা না করতে পারা, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর না থাকা,পর্যাপ্ত আই সি ইউ না থাকা, বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টিনে রাখতে না পারা ইত্যাদি। এবার আসি করোনা মোকাবিলায় : বাংলাদেশ বেতারে সকাল সাতটার খবরের মাঝ বিরতিতে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শোনা যায়। সেখানে তিনি বলেন যে বাঙালী বীরের জাতি। ৭১ সালে যেমন বীরত্ব দেখিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশকে জয় করেছে ঠিক তেমনি নাকি করোনা ভাইরাস মোকাবেলা করতে পারবে। সত্যি কথা বলতে গেলে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় শক্তিসামর্থ্য পুরোপুরি উহ্য বিষয়। যদি তা নাই হতো আমেরিকা এমন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তোনা। এবার আসি আমাদের মন্ত্রীদের কথায়। আগে একটু দেখে নিই স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবের মন্ত্রীসভায় যারা সচিবালয়ে ছিলেন তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন : শিক্ষা সচিব : অধ্যাপক কবির চৌধুরী। স্বাস্থ্য সচিব : মুজিব নগর সরকারের চিকিৎসক তোফাজ্জল হোসেন। গণপূর্ত সচিব : প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম। তথ্য সচিব : সাংবাদিক বাহাউদ্দিন চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু প্রতিটি সেক্টরে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুধাবন করেছিলেন তার প্রতিফলন উপরের ক'জনের নাম দিয়েই বুঝতে পারি। আমরা জয় বাংলা জাতীয় স্লোগান করি, মুজিব বর্ষ পালন করি, বঙ্গবন্ধুর নামে কত কি করি কিন্তু তার দেখানো পথ অনুসরণ করিনা। এটাকে বলা যেতে পারে, ফরজ রেখে নফল নিয়ে টানাটানি করা। আর যদি বর্তমান মন্ত্রণালয়গুলোর দিকে তাকাই তবে দেখবো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়গুলোতে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। একটু দেখে নিই সরকারের মন্ত্রীসভায় মাননীয় কিছু মন্ত্রীদের নাম ও শিক্ষাগতযোগ্যতা : ওবায়দুল কাদের : সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয় - বি এ (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ কে আব্দুল মোমেন : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - এম এ (অর্থনীতি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নর্থ-ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, বোস্টন (পিএইচডি)।
ড. হাছান মাহমুদ : তথ্য মন্ত্রণালয় - এমএসসি (রসায়ন) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব লিমবার্গ (পিএইচডি)।
আনিসুল হক - আইন মন্ত্রণালয় - এম এ (ইংরেজি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়, এএলএম, কিংস কলেজ, লন্ডন। তাজুল ইসলাম : স্থানীয় সরকার - মাস্টার্স (অর্থনীতি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ড. দিপু মনি : শিক্ষামন্ত্রী - এমবিবিএস, ঢাকা মেডিকেল কলেজ। মাস্টার্স অব ল, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন। পাবলিক হেলথ, জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি।
সাধন চন্দ্র মজুমদার : খাদ্য মন্ত্রণালয় - বি. এ
টিপু মুনশি : বাণিজ্যমন্ত্রণালয় - বি. এ
নুরুজ্জামান আহমেদ : সমাজ কল্যান মন্ত্রণালয় - বি. কম
শ ম রেজাউল করিম : গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। - বি. এ অনার্স( বর্তমানে তাকে অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে)।
মোস্তফা জব্বার : ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় - বিএ (বাংলা) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মাস্টার্স (সাংবাদিকতা) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই হলো আমাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয় গুলোর অবস্থা। এর ফলাফল হচ্ছে একজন তার কাজ ঠিক মতো করতে না পেরে তা ঢাকতে সে প্রবাসীদের নবাবজাদা বলে সমালোচিত হন। তিনি একবারও ভাবেননি যে তিনি প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের টাকায় এখনো বেতন নেন এবং আগেও নিয়েছেন। দিপু মনি একজন ডাক্তার, জন হপকিন্সে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়েছে তার। প্রথমবার তাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রী না করে করা হলো পররাষ্ট্র মন্ত্রী কিন্তু কেন তা করা হয়েছিলো এখনো আমি বুঝিনি। তখন যাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রী করা হয়েছিলো সে প্রশ্নপত্র ফাঁসের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের দিয়েছে। যে ব্যাচে এ কাজ হয়েছে সেই ব্যাচের কিছু ছেলেপেলে এই আপদকালীন সময়ে ইন্টার্নিশিপ করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ভেবেছিলাম আমাদের শিক্ষা হয়েছে এবার অন্তত দিপু মনি কিংবা ডাক্তার কাউকে দেখবো এই জায়গায়। এইবারও দিপু মনি হলেন শিক্ষা মন্ত্রী। কারণ আগে যিনি এখানে ছিলেন তিনি মাশাল্লাহ! শিক্ষা ব্যবস্থার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। গণহারে জিপিএ-৫ এবং গণহারে পাশের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে সেই সাথে প্রশ্নফাঁস তো ছিলো নিয়মিত ঘটনা। আর প্রতিটি জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার বাসনায় গ্রাজুয়েশনকে মামুলি বানিয়ে ফেলেছেন। সৃষ্ট হয়েছে সাত কলেজের মত আপদ!
এবার আসি স্বাস্থ্য মন্ত্রীর কাছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। এটা স্বাভাবিক তিনি শেক্সপিয়ার যত বুঝবেন চিকিৎসাবিদ্যা তার সিকি ভাগও বুঝেবন না। তার প্রমাণ হলো পিপিই এর স্থলে পিপিপি শুনি আমরা। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য সচিব তিনিও নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। আর একজন আছে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। তার লেখাপড়া অতি উচ্চ কিন্তু কথাবার্তায় মনে হয় তিনি তথ্য মন্ত্রী নন বিএনপি বিষয়ক মন্ত্রী। আমরা এখন বাংলা সাহিত্যের ছাত্র দিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ চালাচ্ছি তা খারাপ কি!
আমরা ক্রিকেট জ্ঞানহীন ব্যক্তিকে বিসিবি প্রধান করি। সাবেক অধিনায়ক সাংসদ থাকার পরও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিই আরেকজনকে যার ফলে দেখি ক্রিকেটাররা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে স্ট্রাইক করে। এগুলোই প্রমাণ করে সরকারের বড় বড় পদে কারা বসেছে। কারা চালাচ্ছে ঢাকার মসনাদ! এবার আসি বিরোধী দলের দিকে। বিভিন্ন দেশে বিরোধী দল ছায়া মন্ত্রীসভা গঠন করে সরকারের কাজের সমালোচনা করে থাকেন। আমাদের একটি কাগজে কলমে বিরোধী দল আছে কিন্তু কাজেকর্মে তা সরকারি। কথাবার্তায় পুরোপুরি আওয়ামী নির্ভর একটি দল। অনেকে এই দল নিয়ে হাসাহাসি করেন। আর একটি দল আছে যারা নিজেদের রাজপথের বিরোধী দল বলে দাবি করেন কিন্তু আমরা তাদের রাজপথ বলতে নয়াপল্টনের সেই পথকেই চিনি অন্যকোনো রাজপথে গত ৭-৮ বছরে বিএনপিকে সেভাবে দেখা যায়নি। বিএনপির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো বিকল্প নেতা তৈরী করতে না পারা। এক খালেদা জিয়ার উপর ভরসা করা বিএনপি এখন যাচ্ছেতাই। এর প্রমাণ হলো গত নির্বাচনে তারা ভাড়া করা নেতা নিয়ে আসলো। রাজনীতির জন্য বিপদ সংকেত হলো যে এতো বড় একটা দল অথচ খালেদা জিয়ার বিকল্প নাই। একজন আছে তাও আবার লন্ডনে বসে রাজনীতির চর্চা করেন। আওয়ামীলীগের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো এই দলটিও শেখ হাসিনার বিকল্প কাউকে বের করতে পারেনি। এর প্রমাণ হলো গতবছর শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন তার ছুটি প্রয়োজন কিন্তু দলের অন্যরা তখন বললেন না তিনি যতদিন থাকবেন ততদিন তিনিই আওয়ামিলীগ প্রধান থাকবেন। ১৯৯১ থেকে এখন পর্যন্ত বড় দুইদল দেশ শাসন করছে ঘুরেফিরে কিন্তু এই দুইজনের বাইরে কোনো আমরা তৈরী করতে পারিনি। এর জন্য হয়তো আমাদের যোগ্য নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগতে হবে। একটি দেশ যখন শিক্ষাখাত এবং চিকিৎসা খাতে অপেক্ষাকৃত কম বিনিয়োগ করে। শিক্ষকদের বেতন ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা সরকারি আমলাদের তুলনায় নগন্য হয়, একটি দেশ যখন এমন ক্রান্তিলগ্নে দলমত নির্বিশেষে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করতে পারেনা, একটি দেশের মন্ত্রীরা যখন জ্বি হুজুর জি হুজুর করে অভ্যস্থ, একটি দেশের শিক্ষকরা যখন রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলে, সরকার যখন শুধু দৃশ্যমান উন্নয়নে বিভোর থাকে তবে সে দেশ শুধু করোনা কেন যেকোনো দুর্যোগেই ধ্বসে যেতে পারে। ভেঙে যেতে পারে দেশের সার্বিক অর্থনীতি।
একটি কথা আছে বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃ কোলে। আমাদেরও এই কথাটা বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। যে যেখানে বিশেষজ্ঞ তাকে সেখানেই দিতে হবে। তবে যদি এমনটা হয় তবে যদি আমরা পারি!


No comments