"বেদনাকে বলেছি কেঁদো না," হেলাল হাফিজ।


ফরিদ উদ্দিন মাসুদ
শিক্ষার্থী ঢা.বি.
হেলাল হাফিজ একজন বাংলাদেশি কবি।যার খ্যাতি আছে দেশজুড়ে সবার কাছে।তরুণদের কাছে তিনি সবচেয়ে বেশিই জনপ্রিয়। হেলাল হাফিজের জীবন বৈচিত্রময়। মাত্র তিন বছর বয়সে গর্ভধারিণী মাকে হারান। ছেলেবেলা থেকেই মা হারানোর যন্ত্রণা দিয়ে তার দুঃখের সাথে পথচলা শুরু। এই দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়েও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান দিব্যি।স্কুল- কলেজ শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে।১৯৬৯ সালে যখন দেশে গণ অভ্যুত্থান চলছিলো তখনই তিনি লিখলেন নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় নামে এক অমর কবিতা  " এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।" এই নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় কবিতাটি কবিকে রাতারাতি আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা এনে দেয়।কবিতার প্রতিটি লাইন যেনো বাঙ্গালী তরুণদের যুদ্বে আহবান করছে।  মুক্তিযুদ্ধের সময় হেলাল হাফিজ অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন। ২৫শে মার্চের ভয়াল রজনীতে তিনি তার আবাসিক হলে ছিলেন না।তিনি ফজলুল হক মুসলিম হলে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতেছিলেন এবং সেখানেই রাত্রি যাপন করেন।সকালে নিজের হলে (ইকবাল হল) এসে দেখেন লাশের মিছিল।তখন হল গেইটে দেখা হয় নেত্রকোনার আরেক কৃতি সন্তান কবি নির্মলেন্দু গুণের সাথে।যাইহোক কবি হেলাল হাফিজ দীর্ঘ সময় নিয়ে তিনি তার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে মনের মাধুরি মিশিয়ে রচনা করেন তার অমর কাব্যগ্রন্থ "যে জলে আগুন জ্বলে"।  কাব্যগ্রন্থটি দিব্য প্রকাশ থেকে বের হয় ১৯৮৬ সালে।এরপর থেকে এখন পর্যন্ত আটাশটি সংস্করণ হয়েছে বইটির।নামে বেনামে কত সংস্করণ হয়েছে তার হিসেব নেই। এর চেয়ে বেশি বিক্রি বাংলা কবিতার কোনো বই আছে বলে আমার জানা নেই।কাহলিল জিবরানের 'দ্য প্রফেট' বাইবেলের পর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে। ঠিক তেমনি আমাদের বাংলা সাহিত্যে হেলাল হাফিজের যে জলে আগুন জ্বলে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে।বই টিতে কবি ৫৬টি পৃষ্ঠা  রেখেছেন।অনেকে মনে করতেন তা ৫৬ হাজার বর্গমাইল বাংলাদেশের প্রতীক।বস্তুতঃ কবি ৫৬ পৃষ্ঠা করেছিলেন প্রকাশক কাগজের ফর্মা মিল রাখতে।  ব্যক্তিগত জীবনে হেলাল হাফিজ কখনো বিয়ে করেন নি।একবার তার মা এক মেয়ে দেখে এসে বলেছিলেন মেয়েটিকে সে তার ছেলের বই বানাবে।তাই হেলাল হাফিজ যেনো মেয়েটিকে দেখে আসে।মেয়েটিকে দেখে এসে মায়ের সামনে হাজির হলে মা জিজ্ঞেস করে মেয়ে পছন্দ হয়েছে কিনা! আর দেখতে কেমন?  উত্তরে হেলাল হাফিজ বলেছিলেন মেয়েটি দেখতে তার মায়ের মতন। মায়ের সাথে প্রণয় হবার নয় তাই সে বিয়ে হয়নি।হেলাল হাফিজ বিয়ে করেননি। এর পেছনে রয়েছে একাধিক নারীর বিরহ।তিনি তার জীবন সীমাবদ্ধ রেখেছেন হিরণবালা,সবিতা মিস্ট্রেস এবং কিশোরী হেলেনের মাঝে।এদের বিরহে কবি কোনোদিন বিয়ে করেনি। হেলাল হাফিজ তার জীবনে একটি মাত্র কবিতার বই লিখেই বিখ্যাত হয়েছেন।আসলে মানুষের বিখ্যাত হওয়ার জন্য শত শত বই লাগেনা।জগতে অনেক কবি-লেখকদের মাত্র একটি বই আছে যা তাদের জগৎ বিখ্যাত করেছে।ফরাসি কবি বোদলেয়ার তার জীবনে একটি মাত্র বই লিখেই আজ তিনি জগৎ বিখ্যাত বোদলেয়ার। আমাদের বোদলেয়ার হল এই হেলাল হাফিজ  হেলাল হাফিজ চেয়েছিলেন আরও কবিতার বই লিখতে কিন্তু তিনিই সাহস পাননি।কারণ প্রথম বই মানুষ যেভাবে গ্রহণ করেছে দ্বিতীয় বই যদি সেভাবে গ্রহণ না করে কিংবা পাঠকের চাহিদা যদি মেটাতে না পারেন সেই ভয়ে। তারপরও ভক্তদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিলো আরেকটি কবিতার বই। অবশেষে কবি আবার হাজির হলেন দুর্দান্ত কিছু কবিতা নিয়ে লেখা তার দ্বিতীয় বই ' বেদনাকে বলেছি কেঁদো না'। বইটি সম্প্রতি দিব্য প্রকাশের ব্যানারে বের হয়েছে।কবির প্রত্যাশা পাঠক যে জলে আগুন জ্বলে বইটির মতোই এই বইটি গ্রহণ করবে।এখন পাঠকের ভালবাসা নিয়ে অসুস্থ কবি বেঁচে আছেন।তার জীবন আটকে আছে প্রেসক্লাবে আর আর হোটেলের চার দেয়ালে। এই নিঃসঙ্গ জীবনে কিশোরী হেলেন,হিরণবালা কিংবা সবিতা মিস্ট্রেসের ভালবাসার অভাব পাঠকদের ভালবাসা দিয়ে পুরণ করছে তিনি।ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়ের কবি হেলাল হাফিজ।

No comments

Powered by Blogger.